মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রধান ঘটনা

 ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চে ও ঐতিহাসিক ভাষনের পর অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতেই গোপালগঞ্জে মুক্তযুদ্ধের প্রস্ততি পর্ব শুরু হয়। এ সময়ে বঙ্গবন্ধু সরকারী কলেজ মাঠে (তৎকালীন কাযেদে আযম কলেজ) ,যুগশিখা ক্লাবে উৎসাহী ছাত্র যুবকদের ডেমি রাইফেল প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তৎকালীন ছাত্র নেতা ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শওকত চৌধুরী ও জাকির হোসেন খসরুর নেতৃত্বে গোপালগজ্ঞের আদালত ভবনের শীর্ষ থেকে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়।

 

পাক সেনাদের ক্যাম্প স্থাপন: ২৫ মার্চ ’৭১ এর কালো রাতে পাক বাহিনী হামলার জের হিসেবে গোপালগজ্ঞের ৩০ এপ্রিল শুক্রবার সকালে হানাদেয় পাকবাহিনী। কোন প্রকার প্রতিরোধছাড়াই পাক বাহিনী গোপালগজ্ঞ শহরে প্রবেশ করে এবং সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে মিলিটারী ক্যাম্প/মিনি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে অবস্থান জোরদার করে । পর্যায়ক্রমে তারা বাড়ী ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িযে নৃশংস তান্ডবলীলা চালায়। ঐ দিন বিকালে সদর উপজেলাধীন মানিকহার গ্রামে হামলা চালায় এবং কায়েদে আযম কলেজের অধ্যাপক সন্তোষ কুমার দাসকে পলায়নরত অবস্থায় ধরে এনে ’৭১ এর বধ্যভুমিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ এলাকায় তিনিই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবি। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলাধীন বৌলতলী, সাতপাড়,গোবরা, পাইককান্দি, ঘো্ড়াদাইড়, কেকানিয়া, সুলতানশাহী, দুর্গাপুর, বাঘাজুড়ি, কাটরবাড়ী, ডালনিয়া, ডোমরাশুর, মালিবাতা, রঘুনাথপুর, মাঝিগাতী গ্রামের হাজার হাজার ঘরবাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তছনছ করে দেয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা/ মুক্তিযোদ্ধা সমর্থকদের প্রায় ২৫০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা সমর্থকদের ধরে এনে ক্যান্টনমেন্টে রাখা হতো পরবর্তীতৈ তাদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হতো।এ সময়ে এলাকার অনেক মা বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে পাক বাহিনীর হাতে।

 

প্রতিরোধ পর্ব : ডা: ফরিদ আহমেদ, কামরুল ইসলাম রইস, নজির আহমেদ তালুকদার,আবুল হাসেম সমাদ্দার, এ্যাডভোকেট  কাজী আব্দুর রশিদ, এ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান (চান মিয়া), আক্থার হেসেন মোকতার প্রমুখ সংগ্রাম কমিটির নেতৃৃবৃন্দ অস্রশস্র সংগ্রহ শুরু করে ২৭ মার্চ সরকারী বঙ্গবন্ধু কলেজ মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প চালু করা হয়। ১১ মে মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক কামরুল ইসলাম রইস,আবুল হাসেম সমাদ্দার, এ্যাডভোকেট কাজী আব্দুর রশীদ, এ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান(চান মিয়া) ভারত চলে যায়। মানিকহারে পাক বাহিনীর হামলার জবাব দিতে প্রথম ক্যাপ্টেন হালিম ও ক্যাপ্টেন মিলুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধকরে এবং দীর্ঘক্ষণ সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মনি সিকদারসহ অন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। ১১ মে তারিখে উরফী গ্রামে ইপিআর  সেনা আব্দুর রবের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধে ৫ জন পাক বাহিনী নিহত হয় এবং ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৯ মে শহরের ট্রেজারী ভেঙ্গে বিপুল অস্রশস্র গোলাবারুদ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানে আব্দুল মজিদ নামের একজন সরকারী কর্মকর্তাসহ ৩ জন নিহত হয়। ক্যাপ্টেন মিলুর নেতৃত্বে পাইককান্দি সীমান্তে পাকসেনাদের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে ১ জন পাকসেনা  আহত হয় এবং৩০/৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসী হতাহত হয়। ২৪ জুন পাকবাহিনীগণ গোপীনাথপুর থেকে রঘুনাথপুর যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং ফিরোজ খা, কিবরিয়া খা, মোতালেব সরদারও শচীন্দ্রনাথ বৈদ্যকে ক্যান্টনমেন্টে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

 

মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী:গোপালগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের তিনটি বাহিনীর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় গঠিত মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব দেন  ইসমত কাদির গামা। এছাড়া ক্যাপ্টেন হালিম, ক্যাপ্টেন মিলু, ক্যাপ্টেন শিহাবুদ্দিনের নেতৃত্বেও আলাদা আলাদা বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপুর্ণ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে । ক্যাপ্টেন জালাল, আব্দুর রহমান, সৈয়দ নওশের আলী, সোবহান কমান্ডারের ভুমিকাও উজ্জ্বল।

 

মুক্তিযুদ্ধের মর্মস্পর্শী ঘটনা : গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয় বিদারক মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটে ১৯৭১সালের ১২/১৩ অক্টোবর। ক্যাপ্টেন হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর খাদ্য সরবরাহকারী একটি কার্গো মধুমতি নদী থেকে ছিনিয়ে আনে কোটালীপাড়ার কলাবাড়ী গ্রামে। খবর পেয়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্টের বিপুল সংখ্যক পাকসেনা  কার্গোটি উদ্ধারের জন্য কলাবাড়ী যায় এবং মুক্তিবাহিনীর উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় গ্রামবাসীর উপর শুরু হয় পাক বাহিনীর নির্মম অত্যাচার। কার্গো উদ্ধার করে প্রায় ২০০ গ্রামবাসীকে ধরে এনে সদর উপজেলায় মধুমতি নদীতে  চোখ হাত পা বেধে বেয়োনেট চার্জ করে ফেলে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

 

গেরিলা বাহিনী: গোপালগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহীদ আব্দুল লতিফ একটি অবিস্মরণীয় নাম। মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্ন থেকেই তিনি এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। এক সময়ে পাক বাহিনীরা তার নিজ গ্রাম ঘোষেরচর আক্রমন করে এবং ব্যাপক অগ্নি সংযোগ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পর্যায়ক্রমে তার আপন ভাই আসাদ, আব্দুল হাই এবং ভাইপো মনিকে ধরে এনে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে জুলাই মাসের শেষ  দিকে একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিবাহিনী নিয়ে ভারত থেকে এলাকায় ফেরার পথে যশোরে পাকবাহিনী সাথে সম্মুখ যুদ্ধে আব্দুল লতিফ শহীদ হন। তার স্মুতিকে ধরে রাখার জন্য তাঁর নামানুসারে লতিফপুর ইউনিয়ন স্বীকৃতি পায়।

 

গোপালগঞ্জমুক্ত দিবস: ’৭১ এর ৭ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জ শহর পাক হানাদার মুক্ত হয়। এ দিন মুক্তিযোদ্ধারা শহরে একটি বিজয় মিছিল বের করে। সে কি আনন্দ-উলত্মাস , ঘরে ঘরে পত পত করে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত সবুজ জমিনে লাল সুর্য খচিত পতাকা। এ দিনটি আজও গোপালগঞ্জবাসীর কাছে চির অম্লান ও উজ্জল হয়ে আছে।